দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বর্জ্য সাধারণত ফেলনা হিসেবে বিবেচিত হলেও কক্সবাজারে পর্যটনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় রান্নার পরিত্যক্ত অংশ, খাবারের উচ্ছিষ্ট এবং পয়ঃবর্জ্যের সংমিশ্রণে উৎপাদিত এই জৈব সার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কক্সবাজার পৌরসভার সমন্বয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে ছোট পরিসরে পর্যটন জোনের হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁর বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে সাফল্য পাওয়ায় ভবিষ্যতে প্রকল্পটি বড় পরিসরে নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক আসেন। পর্যটন মৌসুমে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পর্যটকদের ঘিরে গড়ে উঠেছে সাড়ে ৫ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টসহ অসংখ্য রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে শুধু প্লাস্টিক বর্জ্যই প্রায় ৩৫ টন।
এতদিন আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় এসব বর্জ্যের একটি অংশ নদী ও সাগরে গিয়ে পড়ত। এতে দূষণের কবলে পড়ত নদী, সাগর ও পরিবেশ। সেই দূষণ রোধের পাশাপাশি বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে কক্সবাজার শহরের অদূরে রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বনতলা এলাকায় গড়ে উঠেছে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।
প্রকল্প এলাকায় বিশেষ ধরনের গাড়িতে করে হোটেল-মোটেলের বর্জ্য আনার পর শ্রমিকরা তা বাছাই করেন। পচনশীল বর্জ্য থেকে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন অপচনশীল উপাদান আলাদা করার পর শুরু হয় জৈব সার তৈরির প্রক্রিয়া। দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিবেশের মধ্যেই দিনের পর দিন বর্জ্য নিয়ে কাজ করছেন শ্রমিকরা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্জ্য সংগ্রহের পর প্রায় ৪৫ দিন ধরে বিভিন্ন ধাপে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁর পচনশীল বর্জ্যের ৭০ শতাংশের সঙ্গে ৩০ শতাংশ পয়ঃবর্জ্য মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে জৈব সার। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বর্জ্য ধীরে ধীরে পরিণত হয় সারে। বর্তমানে প্রকল্পে প্রতিদিন ২০ মণের বেশি জৈব সার উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি কেজি সার বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা দরে। পুরো কার্যক্রমে কাজ করছেন ১৮ জন শ্রমিক। বর্তমানে ২০টি হোটেল থেকে পচনশীল বর্জ্য সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।
তবে সম্ভাবনা থাকলেও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্জ্য সংগ্রহের জন্য পুরো কার্যক্রমে রয়েছে মাত্র দুটি গাড়ি। ফলে আরও বেশি হোটেল থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও পর্যাপ্ত যানবাহন, উপকরণ ও জনবলের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।
জৈব সার উৎপাদন কেন্দ্রের চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদার ও সুপারভাইজার মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ বর্জ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার ভিত্তিতে সার উৎপাদন চলছে। বর্জ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত যানবাহন যুক্ত করা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি কাঁচামাল সরবরাহের সংকট ও বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিক বিরূপ পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়।
বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির এই উদ্যোগ শুধু হোটেল-মোটেলের খাবারের উচ্ছিষ্টে সীমাবদ্ধ নেই। বাসাবাড়ি ও পর্যটন এলাকার সেফটি ট্যাংকের বর্জ্য নিয়েও চলছে সম্ভাবনার পরীক্ষা। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে কয়েক দফায় সেফটি ট্যাংকের বর্জ্য থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জৈব সার তৈরি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতদিন যে বর্জ্য অপসারণ বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, তা নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সার তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে এ কার্যক্রম চালু করা গেলে একদিকে সেফটি ট্যাংকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমবে, অন্যদিকে বর্জ্য থেকেই তৈরি হতে পারে নতুন আয়ের পথ।
দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় কক্সবাজারে ভবিষ্যতে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা গেলে পরিবেশ দূষণ রোধের পাশাপাশি জৈব সার, প্লাস্টিক পণ্য, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে ফেলনা বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমএস/